একজন আন্দোলন-কর্মীর চোখে জলবায়ু সংক্রান্ত শিক্ষায় যে বিষয়গুলো নেই
Umme Abiha Saima

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল সবসময় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াইয়ে ব্যস্ত। এর ভৌগোলিক অবস্থান একে করে তুলেছে জলবায়ু সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সাইক্লোন, লবণাক্ততা, আর নদীভাঙনের মতো দুর্যোগ এই অঞ্চলের মানুষের জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতা। আর এই বাস্তবতার ভেতরে সাতক্ষিরায় জন্ম নিয়েছে ‘বিন্দু’র মতো সংগঠন। বিন্দু স্বপ্ন দেখে ’জলবায়ু ন্যয্যতা’র। এই স্বপ্ন মিশে আছে সাতক্ষিরার বাস্তবতার সাথে।
যদিও বিন্দু ২০১৬ সাল নাগাদ দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার কার্যক্রম শুরু হরে, তবে এর সংশ্লিষ্টজনেরা উচ্চ মাধ্যমিকে থাকাকালিন সময় থেকে জলবায়ু সংকট নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। তাদের নেতৃত্বে ‘বিন্দু’ আজ শুধু একটি সংগঠন নয়, একটি অনুপ্রেরণা। স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের অনেকেই এখন নিজের মতো করে ছোট ছোট দল গড়ে তুলছে, নিজেদের মতো করে কাজ করছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায়।
বিন্দুর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক জান্নাতুল মাওয়া বলেন,
“তরুণেরা সবসময় শিখতে চায়, জানতে চায়। যদিও জলবায়ু সংকটের ব্যাপারে পর্যাপ্ত তথ্যের উৎস খুব কম, তবুও তারা তাদের জানাশোনাকে এগিয়ে নিতে চায় এবং একটি টেকসই জলবায়ু প্রতিরোধ সক্ষম সম্প্রদায় গড়ে তুলতে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।”
তিনি মনে করেন, অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ু জ্ঞান জরুরি। উপকূলের জলবায়ু সংকট, ইতিহাস, অভিযোজন—এসব পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরতে হবে। তিনি আরো বলেন, পাঠ্যবই ও মিডিয়ায় জলবায়ু নিয়ে আংশিক চিত্র ফুটে উঠে, জলবায়ু মোকাবেলায় প্রকৃত সংগ্রামের ছায়াটুকুও পড়ে না সেখানে। বিশেষ করে যারা সমাজে আগে থেকেই পিছিয়ে আছে- যেমন নিম্নআয়ের পরিবার, দলিত সম্প্রদায়, প্রান্তিক নারী—জলবায়ু মোকাবেলায় তাদের সংগ্রাম হয় আরও কঠিন।
তিনি আরও বলেন,
”এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে দরকার স্থানীয় মানুষদের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া সমাধান। কারণ আমাদের স্কুলের বইগুলোতে এখনো এমন কোনো শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত হয়নি, যা জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাস্তবজ্ঞান দেয়। ফলে ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে না নিজেদের জীবনের সঙ্গে এই জ্ঞান মিলিয়ে দেখা সম্ভব হচ্ছে, না তাদের এলাকা বা দেশের উপকারে তা লাগানো যাচ্ছে।”
এই দক্ষতার ঘাটতি পূরণ করতে মাওয়া একটি প্রস্তাব রাখেন—বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ুগত বৈচিত্র্য, অভিযোজনের ধরন ও এর পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ঘিরে একটি ‘ক্লাইমেট ক্লাস্টার’ তৈরি করা যেতে পারে। যা তিনি মনে এলাকা ও সম্প্রদায়গুলোর জন্য কার্যকর হয়ে উঠবে। তার মতে, এনজিওগুলোর ওয়ার্কশপ আর প্রশিক্ষণগুলো আরও প্রাণবন্ত হওয়া উচিত—যেখানে অংশগ্রহণ থাকে, শেখা হয় মজার মজার অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে। এই ভাবনার পেছনে এক বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন তিনি। ActionAid-এর একটি কর্মসূচিতে একবার তাঁরা নৌকায় চড়ে নদী বোঝার চেষ্টা করেছিলেন। এমনভাবে শেখানো মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না, বরং মানুষকে টানে, ভাবায়। এতে স্থানীয়রা যেমন নিবিড়ভাবে যুক্ত হতে পেরেছিল, তেমনি পেশাদাররাও প্রাণবন্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পেরেছন।”
জান্নাতুল মাওয়া আরও বলেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষের উচিত জলবায়ু পরিবর্তণের ঝুঁকি মোকাবেলায় বিভন্ন কৌশল খুঁজে বের করা এবং ধীরে ধীরে সবুজ অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হওয়া। তিনি মনে করেন, পাঠ্যক্রমে রিফ্লেকটিভ বা সৃজনশীল অনুশীলনের অভাব রয়েছে, যা থাকলে শিক্ষার্থীরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আরও উদ্ভাবনী ও মননশীল হতে পারত।
জলবায়ু সচেতনতার জ্ঞানের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন:
“যখন আমরা জাতীয় পর্যায়ের জলবায়ু বিষয়ক কোনো আলোচনায় অংশগ্রহণ করি, তখন দেখতে পাই মানুষের মধ্যে জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক জ্ঞানের অভাব কতো বড় একটি সমস্যা। এই অভাবের কারণে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দক্ষতা কমে যায় এবং মানুষ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না, যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। যদি জাতীয় পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কিংবা সরকার নিজেই জলবায়ু পরিবর্তন ও তার সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে স্পষ্ট ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা না দেয়, তাহলে শুধু উন্নয়ন খাতের কাজ দিয়েই এই সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে না।”
এনজিও পেশাজীবীদের প্রশিক্ষণ প্রসঙ্গে মাওয়া বলেন:
“অনেক ক্ষেত্রেই এনজিও কর্মীরাই জলবায়ু, পরিবেশ বা দুর্যোগ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারনা রাখেন না। একবার একটি প্রশিক্ষণে একজন ফিল্ড অফিসার আপা মিটিগেশন নিয়ে জানতে প্রশ্ন করেন। তখন দেখলাম উপস্থিত প্র্যকটিসনার জলবায়ু মিটিগেশন আর দুর্যোগ মিটিগেশন নিয়ে স্পষ্ট না। আরেকটা কথা হলো, আমরা ‘রেজিলিয়েন্স’ আর ‘অ্যাডাপটেশন’ শব্দগুলো নিয়েও ভুল বুঝি। এইসব জ্ঞানের ঘাটতি পূরণ করা দরকার। পেশাজীবী হিসেবে আমাদের ‘রিসোর্স পার্সন’ হতে হবে। কোনো প্রকল্প শুরু করার আগে অন্তত একবার প্রশিক্ষণ বা হাতে-কলমে শেখার সুযোগ থাকা উচিত।”
মাওয়া বিশ্বাস করেন, বিন্দু যে এলাকা ও সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করে, তাদের নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে ভালো বোঝাপড়া দরকার। যাতে তারা নিজেরাই নতুন দক্ষতা শিখে জীবিকার বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে, নিজেদের এলাকার সম্পদগুলো যাতে পরিবেশের ক্ষতি না করে ব্যবহার করতে পারে, সেটাও যেন তারা জানতে পারে।
মাওয়া বলেন,
“আঞ্চলিক পর্যায়ে যারা কাজ করছেন—তরুণ হোক বা পেশাজীবী—সবারই আগে জানতে হবে ‘সবুজ অর্থনীতি’ বলতে কী বোঝায়। জানতে হবে, কৃষিতে কীভাবে সবুজ ভাবনা যুক্ত করা যায়, আর কীভাবে একটা টেকসই সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তরুণদের অবশ্যই শেখা দরকার কীভাবে গবেষণা করতে হয়, কীভাবে ফান্ড সংগ্রহ করতে হয়। কারণ, এইসব দক্ষতা না থাকার কারণে অনেক সময়ই আমরা তথ্য-প্রমাণ দেখাতে পারি না বা ঠিকভাবে ফান্ড তুলতে পারি না। ফলে, স্থানীয় সরকারের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।”
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাষাবাদে নতুন প্রযুক্তি আর দক্ষতার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে জান্নাতুল মাওয়া বললেন, এখন সময় এসেছে লবণ সহনশীল ধান বা ফসলের মতো প্রযুক্তি সম্পর্কে শেখার—ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে পেশাজীবী, সবাইকে।
তিনি বললেন,
“লোকজনকে আগে জানতে হবে ‘অ্যাগ্রোইকোলজি’ কী। তখনই তারা বুঝবে কীভাবে লবণ সহনশীল বীজ ব্যবহার করলে জীবিকা আর অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো যায়।”
তার মতে, জলবায়ু দুর্যোগ সম্পর্কে জ্ঞান তখনই কাজে দেবে, যখন ছাত্রছাত্রী আর পেশাজীবীরা বর্তমান সময়ের দুর্যোগের ধরন আর প্রবণতা সম্পর্কে জানবে এবং সে অনুযায়ী তাল মিলেয়ে চলতে পারবে:
“আমাদের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যে জ্ঞান আছে, তা অনেকটাই পুরনো—২০-৩০ বছর আগের বাস্তবতা থেকে এসেছে। তখনকার মতো দুর্যোগ তো এখন আর হয় না। তাই সময় বদলাচ্ছে, আমাদেরও জানতে হবে, প্রশিক্ষিত হতে হবে নতুন গবেষণা, নতুন প্রযুক্তি, নতুন জীবিকার উপায় আর জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন দিকগুলো নিয়ে।”
সবুজ ভবিষ্যতের দিকে এগোতে গেলে শুধু কাজ জানলেই হবে না—বরং পেশাজীবীদের জন্য বাজার বুঝতে পারা এবং কিভাবে বাজারজাত করতে হয় সেটি বুঝতে পারাও জরুরি, এমনটাই মনে করেন মাওয়া।
তিনি বলেন,
“শুধু দক্ষতা আর উৎপাদন থাকলেই হবে না, যদি আমরা বাজার কেমন চলছে আর কিভাবে বাজারজাত করতে হয় সেটা না বুঝি। BINDU-তে আমরা “সুপারি”-র পাতার তৈরি পরিবেশবান্ধব একটি থালা বানাই, কিন্তু বাজারে সেটার জায়গা করে নিতে পারিনি। কারণ আমাদের মার্কেটিং সম্পর্কে তেমন জ্ঞান নেই। ফলে আমার আয়ের একটা পথ হারাতে বসেছি। তাই জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজনযোগ্য পেশার পাশাপাশি বাজার বোঝা আর বাজার ধরার কৌশল শেখাটাও খুব দরকার।”
সংস্থাটি সম্পর্কে:
বিন্দু একটি নারীবাদী যুব সংগঠন, যারা মানবাধিকার, নারী ক্ষমতায়ন এবং সমতা নিয়ে কাজ করে। তারা লিঙ্গ-সংবেদনশীল জনসেবা, স্থানীয় পর্যায়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বাস্তবায়ন, মানসম্পন্ন শিক্ষা, জলবায়ু ন্যায়বিচার এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পরিবেশ তৈরির পক্ষে সোচ্চার।

