চূয়াডাঙ্গার নারীরা
Umme Abiha Saima

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাপী যেসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা এখন বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। কারণ, কার্বন নির্গমন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা যথেষ্ট পরিমাণে সেট করা হয়নি। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর নীতিমালা না থাকায়, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর পেছনে বড় কারণ হলো, পৃথিবীর সব অঞ্চলে জলবায়ুর প্রভাব সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে না। উন্নত দেশগুলো তাদের বড় বড় কারখানা গড়ে তোলে দরিদ্র দেশগুলোতে, আর তাদের বর্জ্যও ফেলে দেয় সেখানেই। ফলস্বরূপ, দরিদ্র দেশগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ডা. শোভা সুরি জানিয়েছেন, কম আয়েরা মানুষরা- যারা প্রয়োজনীয় সম্পদ ও পরিষ্কার পানির অভাবের মধ্যে থাকে- তাদের জলবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই রোগগুলো আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এছাড়া, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে বন্যা ও ভূমি ক্ষয় হয় এবং লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে, যা মানুষের জীবিকা কেড়ে নেয় এবং অনেককেই বাধ্য করে তাদের বসতভূমি ছেড়ে যেতে। (সূত্র: “Fair Vermeiden,” ২০২৩)
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অনেক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এর কারণ দেশটা বিশ্বের তিনটি বড় নদীর মোহনায় অবস্থিত, গড়ন নিচু এবং জমি সমতল। তাই অন্যান্য দেশের তুলনায় এখানে জলবায়ুর প্রভাব অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে জলবায়ু পরিবর্তন চলতে থাকলে দারিদ্র্য কমানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং অনেক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
২০২৪ সালের মে মাসে ‘দ্য ডেইলি স্টার’ একটি খবর প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয় চুয়াডাঙ্গায় বছরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড হয়েছে। দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি এই তাপদাহে ভুগছে। ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’-এর মামুন নামে এক প্রতিবেদক জানান, চুয়াডাঙ্গার এমন গরম হওয়ার কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। ভারতের মধ্যপ্রদেশ থেকে গরম বাতাস এখানে এসে ঢুকে, এবং পূর্ব দিকে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। তাই চুয়াডাঙ্গা গরমের শুরুতেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব দেখে।
এই তাপদাহে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় বয়স্করা, নারীরা এবং শিশুরা। স্কুলে পড়া শিশুর বাবা-মায়ের মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে, জলবায়ু সংকটের কারণে তারা কত ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। তারা তাদের এলাকায় বড় ধরনের পরিবেশগত পরিবর্তন নিয়ে কথা বলেছিল। বিশেষ করে আবহাওয়ার নিয়মিত রূপান্তর কৃষির ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেটা নিয়ে তারা ভাবছিল। তারা বলল, হঠাৎ করে খুব গরম পড়া, বর্ষা কমে যাওয়া আর শিলাবৃষ্টি ফসল নষ্ট করছে। এর ফলে কৃষকরা অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছেন আর খাবারের অভাব বাড়ছে। এছাড়া, গরমের কারণে মানুষ আর পশুপাখিদের মধ্যে অসুস্থতার পরিমাণ বেড়ে গেছে। তারা গত দশ বছরের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে দেখাল, এখন নিয়মিত বৃষ্টি কম হচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মা-বাবারা তাদের এলাকার বদলানো পরিবেশের কথা বললেন। বিশেষ করে বর্ষাকালে হঠাৎ করে তীব্র গরম পড়ার বিষয়টা তারা উল্লেখ করলেন। এমন চরম আবহাওয়ার কারণে ফসল ধ্বংস হচ্ছে এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম করতেও অনেক অসুবিধা হচ্ছে। খরা কৃষির ওপর খুব বাজে প্রভাব ফেলেছে। ফসল কম হচ্ছে, পশুপাখি মারা যাচ্ছে, আর কৃষকদের আর্থিক সংকট বাড়ছে। বৃষ্টি না হওয়ায় এলাকার অবস্থা অনেক খারাপ হয়েছে। তারা বললেন, তারা পাম্প মেশিন দিয়ে ফসলের জন্য পানি দেয়, কিন্তু তাতে ফসলের জল ঠিকমতো হয় না। পানি তাড়াতাড়ি বাষ্পীভূত হয়ে ফসল শুকিয়ে যায়। তারা মনে করিয়ে দিলেন, আগে এখানে সব ঠিকই থাকত। বাংলা বছরের তৃতীয় মাসে প্রচুর বৃষ্টি হত। খাল-বিল জল দিয়ে পূর্ণ থাকত। তখন এত সহজে চলাচল করা যেত না, কারণ বৃষ্টি আর কাদা থাকত। এখন সব কিছু একেবারে বদলে গেছে, তারা বললেন।
”এখন বাংলা বছরের তৃতীয় মাস- আষাঢ়। এই সময়ে বৃষ্টি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখন এখানে চরম গরম পড়ছে, বর্ষার কোনো খবরই নেই। আমাদের ফসলগুলো মাঠে পুড়ে মারা যাচ্ছে। পানি ছাড়া ফসলগুলো টিকে থাকতে পারছে না। গরমের কারণে ফসল গজানোর আগেই পুড়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দশ বছর আগে আষাঢ় মাসে বৃষ্টি হত, সবকিছু সময়মতো হতো। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন এই মাসটা যেন চৈত মাসের মতো শুষ্ক হয়ে গেছে। আগে ধানের মাঠে প্রচুর ফসল হতো, কিন্তু এখন এত গরম থাকার কারণে আমরা ফসল ঘরে আনতেই পারি না। ফসল মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়।”
চুয়াডাঙ্গার পরিস্থিতি অনেকটাই চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশগত পরিবর্তণের কারনে এখানে অনেক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। মানুষ এবং পশুপাখির মাঝে জ্বর, ডায়রিয়া ও বিভিন্ন অসুস্থতা খুবই বেড়ে গেছে। এটা একটা বড় স্বাস্থ্য সংকট সৃষ্টি করেছে। তাই এই সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করার জন্য মনোযোগ দেওয়া খুবই জরুরি। বৃষ্টির অভাবে আমের ফলনও কমেছে, তার ওপর আমের আকার ছোট ছোট হয়ে যাচ্ছে।
”আমাদের এলাকায় বেশি গরমের কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বাচ্চারা প্রায়ই ডায়রিয়ায় ভুগছে। জ্বরও হয় প্রায়। জ্বর থেকে সুস্থ হতে অনেক সময় লাগে। অনেকসময় বাচ্চাকে স্কুলে যাওয়াও বন্ধ করে দিতে হয়। এখন তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। আমরা এখন অনেক সময় বাচ্চাদের নিয়মিত স্কুলেও পাঠাই না।”
”কয়েক দিন আগে এক পরিবারে গরমের কারণে তিনটি গরু মারা গেছে। এবার বৃষ্টি না হওয়ায় পরিবেশ শুকনো হয়ে গেছে, তাই চাষাবাদ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। গরুগুলো মাঠে খাবারের অভাবে মারা গেছে। বৃষ্টি আর বাতাস না থাকার কারণে কলা গাছ ও গাছের ছোট ছোট চারা মারা গেছে। এখনকার অবস্থা এমন। মানুষ বেশি সময় বাইরে থাকতে পারে না। জ্বরের কারণে অনেকেই কষ্ট পাচ্ছে। জ্বর থেকে সেরে ওঠতেও ১০ থেকে ২০ দিন সময় লাগে। আরেকটি সমস্যা হলো রাতের বেলায় বিদ্যুৎ না থাকা। এর কারণে স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়ছে এবং বিশেষ করে বাচ্চা ও মায়েদের অনেক অস্বস্তি হচ্ছে।”
রাতের বেলা বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। এই সমস্যার কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকি বেড়ে গেছে; বিশেষ করে শিশুরা ও মায়েরা বেশি অসুবিধায় পড়ছে।
“রাতের বেলা বিদ্যুৎ না থাকায় আমরা ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না। দিনে একটু মানা যায়। কিন্তু রাতে ঘুম না হওয়া আর তাপমাত্রার ওঠানামা আমাদের অসুস্থ করে তোলে।”
“সকালে উঠলে পুরো শরীরে এত ব্যথা হয় যে মনে হয় শুয়ে থাকা ভালো, উঠতে ইচ্ছে করে না। রাতে ঘুমাই, কিন্তু সকালে ব্যথার কারণে উঠতে পারি না। কখনও কখনও জ্বরও হয়। এমনও হয় যে জ্বর আছে কিনা জানি না, কিন্তু মুখের ভিতরে জ্বর ফোঁড়া উঠে।”
আলোচনার সময় বেশিরভাগ নারী বললেন যে, অতিরিক্ত গরমের কারণে তাদের মাথায় মাইগ্রেনের মতো তীব্র ব্যথা হয়। তারা তাদের তীব্র যন্ত্রণার কথা জানালেন, এবং জানালেন এত কষ্টের মাঝেও ঘরের কাজ করতে হয়।
“মাথার এক পাশে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, আর ইদানিং জানতে পারলাম এটা মাইগ্রেনের লক্ষণ হতে পারে। আগে তো আমি এই রোগের কথা জানতামই না। আমার গরম আর সূর্যের আলোতে বেশী খারাপ লাগে, তাই তাপমাত্রা বেশি হলে মাথাব্যথা আরও বেড়ে যায়।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনকূটনীতি বিভাগের পরিচালক (সান, ২০২৪) বলেছেন, দেশের বিভিন্ন জায়গায় তীব্র গরমের তাপ অনুভূত হচ্ছে, যা মানুষের জীবন যাপনকে ব্যাহত করছে। বিশেষ করে কৃষক, খেতমজুর, রিকশাচালক, ভ্যান বিক্রেতা এবং ট্রাফিক পুলিশরা এই গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছে। শিশু ও বৃদ্ধদের মতো দুর্বল মানুষদের জন্য গরমের কারণে অসুস্থতা ও পানিশূন্যতার ঝুঁকি অনেক বেশি। যারা আগে থেকেই দুঃখ কষ্টে থাকেন, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও খারাপ। তীব্র গরম, বৃষ্টির অভাব এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে কৃষিকাজে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেক অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে এবং খাবারের অভাব তৈরি হয়েছে। এছাড়া গরমের কারণে মানুষের এবং গরু-ছাগলের মধ্যে অসুস্থতার মাত্রাও বেড়ে গেছে। এসব কারণে চুয়াডাঙ্গা এখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে পরিণত হয়েছে।

