তামিলনাড়ুর গ্রামীণ পরিবর্তনের গল্প: ‘নিজ গ্রামকে জানো’ উদ্যোগ
Umme Abiha Saima

১৯৮০-এর দশকের শুরুতে নিকোলাস চিন্নাপ্পান তামিলনাড়ুর এক প্রত্যন্ত গ্রামে “ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি” (IRDS) প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল দলিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচলিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা। তখন থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ আন্দোলন—যা পরে জমির অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার মতো নানা বিষয়কেও অন্তর্ভুক্ত করে।
আন্দোলনের সূচনা
প্রথমদিকে IRDS দলিত শিশুদের জন্য পানীয় জল, বাসস্থান ও শিক্ষার সুযোগ তৈরিতে কাজ করত। কিন্তু তারা খুব শিগগিরই বুঝতে পারে যে সমস্যার মূল শিকড় আরও গভীরে—তা হলো জমির অভাব। জমি ছাড়া গ্রামের জীবন প্রায় অসম্ভব, আর জমি না থাকায় দলিতরা উচ্চবর্ণ হিন্দু জমিদারদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, যার ফলে বৈষম্য আরো স্থায়ী হয়।
১৯৯০-এর দশকে IRDS একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারে—ব্রিটিশ আমলে দলিতদের জন্য বরাদ্দ কিছু 'ডিপ্রেসড ক্লাস ল্যান্ড' বা 'পঞ্চমি জমি' আজ landlords বা সরকারের নানা প্রকল্পে হারিয়ে গেছে।
এই সত্য জানার পর ১৯৯৪ সালে দলিতরা জমির দাবি করতে গেলে পুলিশি হামলার শিকার হয়। এই ঘটনার পরই গঠিত হয় দলিত ল্যান্ড রাইটস ফেডারেশন। এরপরের দুই দশকে তারা লড়াই করে পুনরুদ্ধার করে প্রায় ৩,০০০ একর পঞ্চমি জমি—যা মূলত দলিতদের জন্যই বরাদ্দ ছিল। তবে লড়াই এখানেই থামে না। এরপর আসে নতুন চ্যালেঞ্জ: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) ও কর্পোরেট দখল, যা শুধু দলিতদের নয়, আদিবাসী, জেলে ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জীবনকেও হুমকির মুখে ফেলে।
জমি থেকে কমন সম্পদের দিকে
IRDS বুঝতে পারে যে, জমির অধিকারের সঙ্গে শুধু কৃষির নয়, সমাজ ও অর্থনীতির বৃহত্তর বিষয়গুলোও জড়িত। ২০১১ সালে তারা গঠন করে তামিলনাড়ু ল্যান্ড রাইটস ফেডারেশন, যা দলিত, আদিবাসী, জেলে ও শহরের বস্তিবাসীদের এক ছাতার নিচে এনে সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
এবার আন্দোলন শুধু জমির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি—এটি পরিণত হয় কমন সম্পদ রক্ষার আন্দোলনে। গ্রামের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বন, পুকুর, খাল—এসব কমন রিসোর্স রক্ষা করাও আন্দোলনের অংশ হয়ে ওঠে।
‘নিজ গ্রামকে জানো’ উদ্যোগের জন্ম
বিশ্ব ও স্থানীয় পর্যায়ে চাপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে IRDS দুই ধরণের কাজ শুরু করে: একদিকে অন্যায় নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, অন্যদিকে টেকসই বিকল্প তৈরি। এই ভাবনা থেকেই ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে শুরু হয় ‘Know Your Village’ বা ‘নিজ গ্রামকে জানো’ প্রোগ্রাম।
এর উদ্দেশ্য ছিল—তরুণদের আবার তাদের গ্রামের সঙ্গে যুক্ত করা এবং নিজ সম্প্রদায়ের উপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার জায়গা তৈরি করা। এই প্রোগ্রাম চালু হয় তামিলনাড়ুর ৫০টি গ্রামে। এখানে তরুণ-তরুণীরা শেখে তাদের গ্রামের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত বাস্তবতা সম্পর্কে—কীভাবে জমি বিতরণ হয়, কীভাবে টেকসইভাবে জীবিকা গড়া যায়, আর পরিবেশ কীভাবে রক্ষা করা যায়। এরপর তারা এই জ্ঞান নিজেদের সহপাঠীদের মধ্যেও ছড়িয়ে দেয়।
নিকোলাস চিন্নাপ্পানের জন্য এই প্রোগ্রামটা খুবই ব্যক্তিগত। তিনি জানান, কোভিড মহামারির সময় বহু অভিবাসী শ্রমিক গ্রামে ফিরে এলেও তাদের জন্য কোনো কাজ ছিল না। এই বাস্তবতাই দেখিয়ে দেয়—নিজ গ্রামে সুযোগ তৈরি করাটা কতটা জরুরি।
কার্যকর শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন
এই প্রোগ্রামের মাধ্যমে তরুণরা শিখছে অর্গানিক কৃষি, ঔষধি গাছ সংরক্ষণ ও কমন সম্পদের যত্ন নেওয়ার মতো দক্ষতা। একইসঙ্গে তারা শেখে কীভাবে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান গ্যারান্টি আইন (MNREGA) বাস্তবায়ন করা যায়—যার আওতায় গ্রামবাসীরা বছরে ১০০ দিনের কাজ পেতে পারে।
এইভাবে পরিবেশ রক্ষা এবং অর্থনৈতিক টেকসই জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে
‘নিজ গ্রামকে জানো’ উদ্যোগটি এখন একটি শক্তিশালী প্রোগ্রামে পরিণত হয়েছে। IRDS আশা করছে, এটি হবে গ্রামীণ তামিলনাড়ুর মর্যাদা, সমতা এবং টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। নিকোলাস চিন্নাপ্পানের কাছে এই কাজ শুধু বর্তমান সমস্যা মোকাবেলা নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন গড়ে তোলার প্রয়াস।
তরুণদের মধ্যে বিনিয়োগ করে, IRDS এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে চায়—যারা কমন সম্পদের গুরুত্ব বোঝে, ন্যায়বিচার রক্ষা করে এবং আত্মনির্ভরশীল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে।

