জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা সম্প্রদায়ে নারী অধিকার ও সাহসিকতার নেতৃত্বের গল্প
Umme Abiha Saima

রেখা রানী, শ্যামনগর নারী শ্রমিক উন্নয়ন সংঘের সাধারণ সম্পাদক, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিজের জীবনে স্পষ্টভাবে দেখেছেন। তিনি পদ্মপুকুর গ্রামে বড় হয়েছেন এবং বিয়ের পর শ্যামনগর ইউনিয়নেরই আতুলিয়ায় চলে যান। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি দেখেছেন, কীভাবে লবণাক্ততা ধীরে ধীরে উর্বর জমিকে নিষ্প্রাণ করে তুলেছে, যেখানে এখন আর ফসল হয় না (Rezoyana et al., 2023)। পানির অভাব সমস্যাটাকে আরও জটিল করেছে—এমনকি অগভীর নলকূপ থেকেও এখন লবণাক্ত পানি উঠে, যার ফলে বর্ষাকালের বাইরে ধান চাষ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
“পানি কমে যাওয়ায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এ কারণে গরমে আমরা সবজি চাষ করতে পারি না। এতে মানুষ গ্রাম ছেড়ে বাইরে কাজ খুঁজতে চলে যাচ্ছে”, বলেন রেখা।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামের মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে দিচ্ছে। কেউ কেউ নিজেদের জমি চিংড়ি-চাষিদের কাছে লিজ দিচ্ছে, আবার কেউ কেউ মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে বাইরে চলে যাচ্ছে বা ইটভাটায় কাজ করছে। এই পরিবর্তনের ফলে শ্রমবাজারে নারী-পুরুষের বৈষম্য আরও বেড়েছে। চিংড়ি ঘেরে প্রায়শই নারীরা কাজ করলও পুরুষদের তুলনায় তাদের মজুরি অনেক কম, যার ফলে প্রান্তিক নারীরা আরও বেশি অর্থনৈতিক চাপে পড়ছে (Quisumbing & Kumar, 2021)।
এই পরিস্থিতিতে, রেখা নেতৃত্বের ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। তার নেতৃত্বে সংঘ সংগঠনটি আন্দোলন করে দৈনিক ১৫০ টাকা মজুরি থেকে বাড়িয়ে ২৫০–৩০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে লবণাক্ত পানিতে কাজ করার ফলে নারীরা নানান শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন—নখ ক্ষয়ে যাওয়া, ত্বকে র্যাশ ও চুলকানি, চুলের রঙ পরিবর্তন, এমনকি যৌনাঙ্গে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায় (Wilbanks, 2017)।এসব কারণে সংঘ সংগঠনটি টয়লেট, বিশ্রামের জায়গা, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা সহায়তার জন্যও দাবি তোলে।
শুধু স্বাস্থ্য নয়, নারী শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে হয়রানিরও শিকার হন। রেখার সংগঠন এই বিষয়েও নারীদের সচেতন ও সক্রিয় করে তুলেছে। এখন তারা একে অপরকে সহায়তা করে এবং অন্যায় মেনে নেয় না।
“আমরা এখন শুধু মজুরি নয়, কাজের পরিবেশ নিয়েও সচেতন। কেউ যদি আমাদের অসম্মান করে, বাজে ভাষা ব্যবহার করে, বা কম মজুরি দেয়—আমরা চুপ থাকি না। আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করি।”
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন চিংড়ি চাষও টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত গরম ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে ঘন ঘন চিংড়ি মারা যাচ্ছে। পানি যখন অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে পড়ে (যেখানে পার্টস পার থাউজ্যান্ড বা PPT বেড়ে যায়), তখন একসাথে অনেক চিংড়ি মারা যায়, ফলে চাষিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়ে। রেখাও এমন ক্ষতির শিকার হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় একটি ঘের লিজ নিয়েছিলেন চিংড়ি চাষের জন্য, কিন্তু গরমে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় চিংড়ি মারা যায়।
“বিয়ের পর আমি দেড় লাখ টাকা দিয়ে ঘের লিজ নিই চিংড়ি চাষের জন্য। খাওয়ার মতো চিংড়ি পেলেও লাভ করতে পারিনি,” বলেন রেখা।
রেখার বাবাও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের ঠিক আগে তিনি একটি চিংড়ি ঘের লিজ নেন, কিন্তু ঝড়ে ঘেরটি একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। এমন ক্ষতি বারবার হওয়ায় চাষিরা এখন নানা নতুন উপায় খুঁজে নিচ্ছেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এখন অনেকেই ঘেরের চারপাশে ছোট ছোট খাল কেটে রাখছেন—যাতে পানি অতিরিক্ত লবণাক্ত হয়ে গেলে মাছগুলো একটু মিষ্টি পানির আশ্রয় পেতে পারে। এতে করে মাছ মারা যাওয়ার হার অনেকটাই কমে এসেছে (Adger, 2010)। রেখার এই কাজ শুধু তার নিজের জন্য নয়—এই অঞ্চলের অনেক নারীর জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এটি বৃহত্তরভাবে পরিবেশগত ন্যায়বিচার ও শ্রম অধিকার রক্ষায় তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্বের একটি দৃষ্টান্ত (Crona et al., 2020)। শ্যামনগর নারী শ্রমিক উন্নয়ন সংঘের এই অর্জন দেখিয়ে দেয়, চিংড়ি চাষের মতো খাতগুলোতে নারী-সংবেদনশীল নীতি না থাকলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় (Islam, 2019)। রেখা এখনও নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন যেন নারী চিংড়ি শ্রমিকরা আরও সুরক্ষিত, সম্মানজনক ও টেকসই পরিবেশে কাজ করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে রেখা রানী এখন এক অনুপ্রেরণামূলক নাম। শ্যামনগরের মতো দূরবর্তী এলাকায় থেকেও তিনি দেখিয়ে দিচ্ছেন—ন্যায্য মজুরি, কাজের উপযুক্ত পরিবেশ, আর নারীদের মর্যাদার জন্য কণ্ঠ তুললে পরিবর্তন আনা সম্ভব। নানা প্রতিকূলতা—লবণাক্ততা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, চাষে ক্ষতি—এসব কিছু থাকলেও রেখা থেমে যাননি। বরং নতুন নতুন অভিযোজন পদ্ধতি চালু করে তিনি শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা ও একতা তৈরি করেছেন। তার এই ভূমিকা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর উন্নয়নে নারীদের অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বকে গুরুত্ব না দিলে প্রকৃত টেকসায়িত্ব ও ন্যায্যতা অর্জন সম্ভব নয়।

