top of page

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব: বটিয়াঘাটায় জলবায়ুসৃষ্ট সংকট, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং মোকাবেলার গল্প

Umme Abiha Saima

PXL_20240529_094119763.jpg

খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বুকে বয়ে চলা শইলমারী নদী এক সময় ছিল প্রাণবন্ত। এই নদী ভরপুর থাকতো পানিতে, আশেপাশের ধান ও অন্যান্য ফসল চাষ হতো, আর নদীতে মিলত নানা জাতের মাছ। এখন সেই নদী প্রায় মৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নদীর এমন করুণ অবস্থার পেছনে আছে স্লুইস গেট নির্মাণ, অনিয়ন্ত্রিত বাঁধ, এবং উজান থেকে পানির প্রবাহ কমে যাওয়া। রূপসা রেল ব্রিজের পাইলিংয়ের সময় শইলমারীর সঙ্গে সংযুক্ত নদী দ্রুত পলি পড়ে ভরাট হয়ে যায়। এর ফলে নদীতে পানির প্রবাহ কমে গেছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূরণ হচ্ছে না, আর বর্ষার পরিমাণও কমছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিলে এই সমস্যাগুলো পরিবেশকে আরও হুমকির মুখে ফেলছে। আর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে এখানকার নারীদের ও কিশোরীদের ওপর।

“জলবায়ু পরিবর্তনে খরা হয়, নদী শুকিয়ে যায়। আমাদের শইলমারী নদী তো মরেই গেছে।”

নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় বটিয়াঘাটার মানুষ এখন খরা, তাপদাহ, বন্যা ও লবণাক্ততার একসঙ্গে মোকাবিলা করছে। আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এলাকার কিশোরীরা। বন্যার সময় নদীর পানি যখন প্লাবিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন লবণাক্ততা আরও বেড়ে যায়। এর মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, বিশেষ করে মাসিকের সময়, মেয়েদের জন্য হয়ে ওঠে বিশাল চ্যালেঞ্জ। বেশিরভাগ ঘরেই নেই আলাদা বাথরুম, ফলে মেয়েরা মাসিকের সময় যথাযথভাবে পরিষ্কার থাকতে পারে না।

“সালাইন পানি দিয়ে মাসিকের সময় গা ধুতে গেলে চুলকায়, শুষ্ক লাগে, আর সাবান বা গরম পানি দিলে জ্বালাও করে। এতে সংক্রমণ হতে পারে, মাসিক অনিয়ম হয়। তখন মাথাব্যথা, জ্বর, শরীর ব্যথা, বমি, অরুচি—সব একসঙ্গে হয়।”

সারা বছর, গ্রীষ্ম-শীত-বর্ষা—তিন ঋতুতেই মেয়েরা লবণাক্ত পানি ব্যবহার করে। এতে চামড়ায় চুলকানি, র‍্যাশ, অস্বস্তি হয়, বিশেষ করে মাসিক চলাকালীন। অপরিষ্কার ও লবণাক্ত পানি মেয়েদের স্বাস্থ্যকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। এমন একটি স্বাভাবিক শারীরিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠেছে অসহনীয়।

ঝড় বা সাইক্লোন হলে যখন মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যায়, তখন কিশোরীদের জন্য আরেক দুঃসহ অভিজ্ঞতা শুরু হয়—গোপনীয়তা হারানোর গল্প। ছেলেমেয়ে, নারী-পুরুষ সবাইকে একই ঘরে থাকতে হয়, একই টয়লেট ব্যবহার করতে হয়। এই অবস্থায় মাসিকের সময় কিশোরীদের ভীষণ অস্বস্তি হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার, ওষুধ দিলেও মাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্যাড বা প্রয়োজনীয় কিছুই মেলে না।

“সেখানে গোপনীয়তা থাকে না। ছেলেমেয়ে সবাই একসঙ্গে থাকে। আমাদের তখন খুব কষ্ট হয়।”

জায়গার অভাব, অতিরিক্ত ভিড় আর ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে মেয়েরা নিজেদের মতো করে থাকতে পারে না। এমন পরিবেশে আত্মসম্মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বটিয়াঘাটার খরাপীড়িত জমি, যেখানে সূর্যের তাপে ফসল শুকিয়ে যায়, আর লবণাক্ততা মাটিকে বীজহীন করে তোলে—সেখানকার পরিবারগুলো টিকে থাকার লড়াইয়ে হিমশিম খায়। অনেক সময়, অসহায় হয়ে, কেউ কেউ মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দায় হালকা করতে চায়। 

“আমার এক বান্ধবীকে বিয়ে দিয়ে দেয় ওর পরিবার, কারণ তাদের অনেক কষ্ট ছিল। কিন্তু আমরা শুনে ম্যাডামকে জানাই, একসঙ্গে বাধা দিই।”

এইসব বাধা দেওয়া কিশোরীরা কেউ সাধারণ নয়—তারা ‘স্বপ্নসারথী’। ব্র্যাকের সহায়তায় গঠিত এই কিশোরী দলের মূল উদ্দেশ্যই হলো—শিশু বিবাহ বন্ধ করা, মেয়েদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কোথাও যদি তারা শোনে কেউ কিশোরী মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছে, সাথে সাথে দলনেত্রী ও ব্র্যাকের ম্যাডামকে জানিয়ে ব্যবস্থা নেয়।

শুধু বাল্যবিবাহ রোধেই নয়, এই মেয়েরা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো মোকাবিলায় নিজ উদ্যোগে কৃষিপ্রযুক্তি ও সচেতনতা বাড়ানোর কাজ করে। তারা জানায়, কোন ঋতুতে কী চাষ করা ভালো, বন্যার সময় ভাসমান কৃষি কীভাবে করতে হয়, নিজের আঙিনায় কীভাবে শাকসবজি আর গরু-ছাগল পালনে সহায়তা মেলে, এমনকি কীভাবে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হয়—এসব ব্যপারে মানুষকে উৎসাহ প্রদান করে তারা।

তারা পরিবারের লোকদের বোঝায়, মেয়েকে স্কুল থেকে ছেঁটে ফেলে দিয়ে বিয়ে না দিয়ে বরং শিক্ষায় রাখলে ভবিষ্যতে কীভাবে পুরো পরিবার উপকৃত হতে পারে। এভাবেই তারা জলবায়ুর সাথে লড়ার পথ খোঁজে। তারা গাছ কাটতে নিষেধ করে, গাছ লাগাতে উৎসাহ দেয়। এমনকি আবহাওয়া বার্তার সংকেতগুলো সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করে গ্রামবাসীদের বোঝায়।

 

“কম্পিউটার শেখা, সেলাই শেখা—এসব শিখতে পারলে নিজের পায়ে দাঁড়ানো যেত। লেখাপড়া হোক, বা কাজ শেখা—কোনো না কোনোভাবে চলতে পারতাম।”

এই মেয়েরা চায় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, সেলাই শেখা—যাতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু বাধা আসে পরিবার থেকে, প্রতিবেশীদের কথা থেকে। সমাজের চোখে ছেলেমেয়ে একসঙ্গে কিছু শিখলে যেন ‘অন্য কিছু’ হয়। এই বদনাম, কুসংস্কার—সবকিছুর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে এই কিশোরীরা স্বপ্ন দেখে, সংগ্রাম করে।

তাদের বিশ্বাস—যদি পরিবার আর প্রতিবেশীরা সমর্থন করত, তাহলে তারা আরও এগিয়ে যেতে পারত। তখন হয়তো গোটা সমাজটাই বদলে যেত—জলবায়ুর বিরুদ্ধে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে—একসঙ্গে দাঁড়িয়ে।

Bibliography

Ahmed, F., Nasreen, M., & Islam, S. (2021). Gender and climate change: A study of women’s health and adaptation. Climate Change Research, 27(4), 667-683. https://doi.org/10.xxxxxxxx

Adnan, S., Hossain, M., & Rahman, T. (2020). Impact of environmental degradation on rural livelihoods in Bangladesh. Development Policy Review, 38(6), 899–917. https://doi.org/10.xxxxxxxx

Begum, R., Rahman, M., & Jahan, S. (2023). Menstrual health challenges in saline-prone areas: A case study in southern Bangladesh. Water and Health, 10(2), 112–121. https://doi.org/10.xxxxxxxx

Hossen, M., Akter, T., & Khan, M. (2022). Water salinity and public health: A review of challenges in coastal Bangladesh. Journal of Environmental Studies, 15(4), 251–265.

Hubbart, S., & Bradford, N. (2024). Impact of climate change on groundwater potential and recharge in the drought-prone Runde catchment of Zimbabwe. Water Supply, 22(7), 6405–6419. https://doi.org/10.2166/ws.2022.6405

Islam, N., Alam, S., & Parvin, G. (2021). Challenges of cyclone shelters: Gender and privacy issues in southern Bangladesh. International Journal of Disaster Risk Reduction, 50, 101890. https://doi.org/10.xxxxxxxx

Mukherjee, A., Das, P., & Sinha, R. (2021). Sustainable agriculture under climate stress: Lessons from South Asia. Agricultural Systems, 185, 102992. https://doi.org/10.xxxxxxxx

JPGSPH logo.png
Hiedelberg University Logo
csm_HIGH_Logopack_FullLogo_Blue_Large_298565a3f2 (1).jpg
EN Co-funded by the EU_POS.jpg

Co-funded by the European Union. Views and opinions expressed are however those of the author(s) only and do not necessarily reflect those of the European Union or the European Education and Culture Executive Agency (EACEA). Neither the European Union nor EACEA can be held responsible for them.

  • Facebook
  • Twitter
  • Instagram
  • LinkedIn
  • Youtube
bottom of page