জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তি ও সক্ষমতা বৃদ্ধি
বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জে রুমা মুণ্ডার অধিকার আদায় ও জলবায়ু অভিযোজনের গল্প
Umme Abiha Saima

বাংলাদেশের শ্যামনগর অঞ্চলের মুন্সিগঞ্জ এলাকায় মুণ্ডা সম্প্রদায় বসবাস করে, যারা জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবের কারণে দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই সম্প্রদায়ের একজন দৃঢ় ও সাহসী কণ্ঠস্বর হলেন রুমা মুণ্ডা, যিনি একজন কমিউনিটি নেতা। তিনি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে নিজের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের মিশনে রূপান্তর করেছেন। তিনি তাঁর সংগঠন “আদিবাসী নারী উন্নয়ন সংস্থা (Adibashi Nari Unnayan Sangstha)” এর মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন, লিঙ্গ সমতা এবং কমিউনিটি ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করছেন। তাঁর এই উদ্যোগ কঠিন পরিবেশে মানুষের জন্য আশা এবং বাস্তব সমাধান নিয়ে এসেছে।
রুমার জীবনযাত্রা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলা চলাকালে কৈখালী থেকে তাকে বাস্তুচ্যুত হতে হয়েছিল, যেখানে তিনি সরাসরি চরম আবহাওয়ার কারণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করেন। ঘূর্ণিঝড় আইলা ও আম্ফান তার সম্প্রদায়কে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু এবং ফসল ধ্বংস করে দেয়। “আমরা আগে বর্ষাকালে আমন ধান চাষ করতাম,” রুমা বলেন, “কিন্তু এখন আমরা তা পারি না, কারণ আবহাওয়া অনেক পরিবর্তিত হয়ে গেছে।” ক্রমবর্ধমান গ্রীষ্মকালীন তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে মুন্সিগঞ্জ এলাকার মানুষের জীবিকা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে বাইরে কাজ করা কষ্টকর হয়ে উঠেছে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি স্মরণ করেন কীভাবে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করেছে: “আমি আগে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতাম। এখন এই তীব্র গরমের কারণে কাজে যেতে পারি না। এমনকি ফ্যানের নিচে বসেও আরাম পাই না।” এই জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে কমিউনিটিতে হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। রুমা জানান, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজন মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে।
কমিউনিটি কার্যক্রমের মাধ্যমে সহনশীলতা গড়ে তোলা
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে রুমা জলবায়ু পরিবর্তন, লিঙ্গ বৈষম্য এবং আর্থসামাজিক সমস্যার সমন্বিত প্রভাব মোকাবিলার জন্য “আদিবাসী নারী উন্নয়ন সংস্থা” প্রতিষ্ঠা করেন। এই সংস্থাটি নিরলসভাবে কাজ করে:
সমান মজুরির জন্য প্রচারণা: নারী দিনমজুররা, বিশেষ করে যারা স্থানীয় ঘের (চিংড়ি খামার)-এ কাজ করেন, তারা প্রায়ই পুরুষদের চেয়ে কম মজুরি পান। পুরুষরা সাধারণত ইটভাটা বা অন্যান্য শিল্পে কাজের সুযোগ পান। কমিউনিটির কিছু মানুষের বিরোধিতা সত্ত্বেও রুমা দৃঢ়ভাবে তার অবস্থানে অটল থাকেন। তিনি বলেন, “এখন হয়তো সমান মজুরি হবে না, কিন্তু ভবিষ্যতে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এটি বাস্তব হবে।”
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ: কম বয়সে, বিশেষ করে মেয়েদের বিয়ের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এই সংস্থার অন্যতম প্রধান কাজ।
নারীর ক্ষমতায়ন: সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার মাধ্যমে রুমা নারীদের নিজেদের কণ্ঠ খুঁজে পেতে এবং একটি ঐতিহ্যগতভাবে পুরুষশাসিত সমাজে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেন।
জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রম
স্থানীয় সমাধানের জরুরি প্রয়োজন অনুধাবন করে রুমা কমিউনিটি-ভিত্তিক জলবায়ু অভিযোজন কৌশলও গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
পরিবেশ পুনরুদ্ধার: বন উজাড় রোধ এবং পরিবেশের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি প্রচার করা।
জ্বালানি দক্ষতা: “বন্ধু চুলা” নামের একটি জ্বালানি-সাশ্রয়ী রান্নার চুলা ব্যবহারে উৎসাহিত করা, যাতে কাঠের ওপর নির্ভরতা কমে এবং ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণ হ্রাস পায়।
স্বাস্থ্য সচেতনতা: হিটস্ট্রোকের মতো তাপ-সম্পর্কিত রোগ প্রতিরোধে কমিউনিটিকে সচেতন করা, যা এখন উদ্বেগজনকভাবে বেশি দেখা যাচ্ছে।
চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যতের পথ
রুমা স্বীকার করেন যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত সামাজিক নিয়ম ও আচরণ পরিবর্তন করা সহজ নয়। কিছু কমিউনিটি সদস্য লিঙ্গ সমতার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেন, আবার কেউ কেউ অভিযোজনমূলক পদক্ষেপগুলোর উপকারিতা নিয়ে সন্দিহান। তবুও তিনি আশাবাদী থাকেন। মুণ্ডা সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সহনশীলতা গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি বিশ্বাস করেন, একটি ভালো ভবিষ্যৎ সম্ভব।
রুমার উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তন কীভাবে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে—এই গভীর উপলব্ধিকে প্রতিফলিত করে। তিনি বলেন, “চরম চ্যালেঞ্জের মুখেও আমাদের একসাথে এগিয়ে আসতে হবে, শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, বরং উন্নতি করার জন্যও।” তাঁর সংগঠন তৃণমূল পর্যায়ের নেতৃত্বের (grassroots leadership) শক্তিকে তুলে ধরে, যা পরিবর্তন আনতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তাদের জীবনের ওপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সাহায্য করে।
বাড়ি-ঘর হারানো থেকে রুমা মুণ্ডার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার এই যাত্রা মানুষের শক্তি ও সাহসের একটি উদাহরণ। নানা কষ্টের মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি। জলবায়ু সমস্যা মোকাবিলা করার পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে তিনি শুধু মুণ্ডা সম্প্রদায়ের উন্নতি করেননি, বরং অন্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্যও একটি ভালো উদাহরণ তৈরি করেছেন।
মুণ্ডা সম্প্রদায় সম্পর্কে আরও জানুন
https://anthropology-bd.blogspot.com/2008/07/cultural-identity-crises-of-munda.html
https://www.dhakatribune.com/bangladesh/308849/never-ending-woes-of-khulna%E2%80%99s-munda-women
https://www.sciencedirect.com/science/article/abs/pii/S2212420923003643
https://www.undp.org/bangladesh/stories/seema-rani-name-inspiration-munda-society

