জেলে সম্প্রদায়
Umme Abiha Saima

উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহ জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চরম ও বিরূপ আবহাওয়ার ঘটনাগুলো যেভাবে বাড়ছে, তাতে এসব অঞ্চলের মানুষ মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে—জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শ্যামনগরের মানুষ, সেখানকার মাছ চাষ, কৃষি ও পর্যটন খাত সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে (Islam et al., 2015)। এসব খাতের পরিবর্তন মানে শুধু অর্থনৈতিক নয়, এখানকার মানুষের সামাজিক, পরিবেশগত ও শারীরিক জীবনেও নেমে এসেছে নানা রকমের চাপ।
তালার জেলেরা—যাঁদের অনেকেই জাতীয় দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন—জীবনযুদ্ধে আরও বেশি অসহায়। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন আরও ঘন ঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে, তখন প্রতিটি ঝড় যেন তাঁদের জীবনে একেকটি নতুন যুদ্ধের সূচনা—জীবন বাঁচানো, জীবিকা টিকিয়ে রাখা, আর ভবিষ্যতের জন্য একটুখানি নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়ার যুদ্ধ।
Adger (1999) উল্লেখ করেন, দুর্বলতা বা ঝুঁকির মানে হলো মানুষের জীবনের এমন এক অবস্থা, যা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। সবাই একভাবে দুর্বল নয়, কারণ প্রত্যেকের জীবন, পরিবেশ এবং পরিস্থিতি ভিন্ন। কারও জীবনে কতটা ঝুঁকি আসবে, তা নির্ভর করে সামাজিক রীতিনীতি, রাজনৈতিক কাঠামো, সম্পদের প্রাপ্যতা, প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ এবং সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যের উপর।
তালা, সাতক্ষীরার একটি অভ্যন্তরীণ উপকূলীয় এলাকা। যদিও এটি উপকূলের আরও নিচু এলাকার তুলনায় হঠাৎ বা ধীরে আসা জলবায়ুজনিত দুর্যোগের প্রভাব কিছুটা কম অনুভব করে, তথাপি আবহাওয়ার বর্তমান পরিবর্তনশীলতা তালার মানুষকেও ক্রমাগত ক্ষতির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে তাপপ্রবাহ ও লবণাক্ততার মাত্রা যেভাবে বাড়ছে, তা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে মানুষকে বিপন্ন করছে, অন্যদিকে মানবদেহেও ফেলছে গুরুতর প্রভাব।
তালার জেলে পাড়ার নারীদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে আরেকটি স্তরের সংগ্রামের গল্প—যেটি শুধুমাত্র জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নয়, বরং দলিত পরিচয়ের কারণে গড়ে ওঠা সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবতা। এই নারীরা জানালেন, কীভাবে সামাজিক প্রান্তিকতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বঞ্চনা তাঁদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলেছে (Jahan, 2024)।
এই নারীদের কেউ এই এলাকায় জন্মেছেন, কেউবা এসেছেন বিয়ের পর। কেউ এখানে বসবাস করছেন ১০ বছর ধরে, আবার কেউ প্রায় ৩০ বছর। এতদিন এখানে থেকেও তাঁদের জীবনে খুব একটা পরিবর্তন আসেনি—অনেক সমস্যার সঙ্গেই যেন অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে তাঁদের জীবন।
তাঁরা জানালেন, আজও তালায় রাস্তাঘাটের তেমন উন্নয়ন হয়নি। ভাঙা রাস্তা আর নিয়মিত বিদ্যুৎ চলে যাওয়া যেন জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতা। এসব সমস্যায় নারীরাই সবচেয়ে বেশি ভোগেন—রান্না, সন্তান সামলানো, ঘরের কাজ সামলে তাঁদেরই দূরের জায়গা থেকে খাবার পানি আনতে হয়। পানির কলসি মাথায় নিয়ে দীর্ঘ রাস্তা হেঁটে আসা যেমন কষ্টকর, তেমনি এতে সময়ও অনেক লাগে।
আগে যখন কেউ নতুন বউ হয়ে এই এলাকায় আসতেন, তখন তাঁদের ঘরের পেছনের দিকেও যেতে দেওয়া হতো না—বাড়ির বাইরের জগৎ যেন ছিল নিষিদ্ধ। আশপাশে যেটুকু পানি পাওয়া যেত—নোনা, দূষিত, বা অস্বাস্থ্যকর—তাই দিয়েই চলতো তাঁদের জীবন। নিরাপদ পানির কথা তখন কল্পনাও করতে পারতেন না।
বর্তমানে ঘরের পেছনের সীমানা পেরোনোর অনুমতি মিললেও সংগ্রাম থেমে নেই—বরং যোগ হয়েছে নতুন ধরনের দায়িত্ব আর ক্লান্তি।
“তখন তো নিরাপদ পানির কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। একটা টিউবওয়েল ছিল, যেটা থেকে প্রায় ৬৫ জন মানুষ পানি ব্যবহার করত। সেই পানি একেবারে স্বাদহীন ছিল, আর খুব লবণাক্ত।”
“সেই সময়টাকেই এখন ভালো বলা যায়। সবাই ওই পানি খেত। পানিটা ছিল একেবারে নোনাজলের মতো—তাই দিয়েই রান্না, ধোয়া-মোছা সব চলত। তখন আমরা নতুন বউ—কোথাও যেতে দেওয়া হতো না।”
“এখন খাবার পানি আনতে হয় অন্য জায়গা থেকে—উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়ির পাশের একটা জায়গা থেকে পানি আনি। প্রতিদিন বড় বোতলে পানি নিয়ে আসি, অনেক সময় লোকাল ভ্যান ভাড়া করেও আনতে হয়।”
তাঁরা জানান, স্থানীয় টিউবওয়েলের পানি লবণাক্ত হওয়ায় পরিবারের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করাও নারীদেরই দায়িত্ব। শুধু খাবার পানি নয়—রান্না, ধোয়া-মোছা, গোসলসহ ঘরের সব কাজে লাগার পানি জোগাড় করাও এক বিশাল চাপ হয়ে দাঁড়ায় তাঁদের জীবনে।
“রান্নার জন্য আমরা টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করি। তবে সেই পানিতে গন্ধ আছে, আয়রনের পরিমাণও অনেক বেশি। গোসল আর কাপড় ধোয়ার জন্য পুকুরের পানি ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের সবার নিজস্ব পুকুর নেই—অন্যের পুকুর ব্যবহার করতে হয়। তারা যদি না দেয়, তাহলে গন্ধযুক্ত সেই টিউবওয়েলের পানিই ব্যবহার করতে হয়—তখন আর কোনো উপায় থাকে না।”
এসব চ্যালেঞ্জ নারীদের ওপর বাড়তি শারীরিক ও মানসিক চাপ তৈরি করে, এবং তাঁদের জীবনের মানোন্নয়নে টেকসই সমাধানের গুরুত্ব তুলে ধরে।
পানি ও অবকাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি, এখানকার নারীরা যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কেও নানা সমস্যার মুখে পড়েন। পরিষ্কার পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন সুবিধার অভাব তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়। পানি বাহিত রোগ, সংক্রমণ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার হার তাই বেশি।
তাঁদের কেউ কেউ বলছিলেন—
“আগে একটা খোলা টয়লেট ছিল, খুবই সাধারণ। সব ময়লা পানি দিয়ে চলে যেত। এখন একটা পাকা টয়লেট হয়েছে।”
“২০১০ সালের বন্যায় আমাদের বাড়ি পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিল। তখন আমরা উঁচু জায়গায় তাঁবু খাটিয়ে থাকতাম, প্রায় এক বছর। পানি এত বেশি ছিল যে নৌকা ঘরের ভেতরে চলে আসত। খুব লজ্জার কথা, কিন্তু তখন কোনো ঠিকঠাক টয়লেট ছিল না। আশেপাশের উঁচু জায়গার মানুষদের কাছে টয়লেট ব্যবহার করার অনুরোধ করতাম। খুব কষ্টের সময় ছিল ওটা—আশা করি, আর কখনো যেন এমন না হয়। আমরা তখন নদীর পাড়ে থাকতাম, খাবার জোগাড় করতেও কষ্ট হতো। কিছু ভালো মানুষ শুকনো খাবার দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল। ২০১১ সালে আমরা আবার আমাদের বাড়িতে ফিরি।”
অন্যদিকে, Hossain et al. (2011) উল্লেখ করেছেন, বঙ্গোপসাগর ঘূর্ণিঝড় ও নিম্নচাপ তৈরির জন্য খুবই উপযুক্ত অঞ্চল। বাংলাদেশের উপকূলরেখা ফানেলের মতো হওয়ায় এখানে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি। বর্ষার আগমুখে ও পরমুখে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ঘনঘন দেখা দেয়। শুধু বাংলাদেশেই বিশ্বের মোট জলোচ্ছ্বাসের প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটে থাকে। গত ৩০ বছরে নানা মাত্রার ঘূর্ণিঝড় দেশে আঘাত হেনেছে, যার ফলে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং অনেক সম্পদ ধ্বংস হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণাক্ত পানি সমস্যা বেড়েছে, যা জীবনমানকে খারাপ করে তুলছে। তাপপ্রবাহে বেশি মানুষ অসুস্থ হচ্ছে, বিশেষ করে বয়স্ক এবং শহরের গরিব জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। নারীরা ও শিশুরা চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানির পরিমাণ ও মান দুটোই কমছে, অথচ সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে বিশুদ্ধ পানি অপরিহার্য। শিশুদের মধ্যে অসুস্থতার প্রধান কারণ হিসেবে অপুষ্টিকে চিহ্নিত করেছেন Hossain et al. (2011)।
তথ্যপুঞ্জি
Adger, W. N. (1999). Social vulnerability to climate change and extremes in coastal Vietnam. World Development, 27(2), 249–269. https://doi.org/10.1016/s0305-750x(98)00136-3
Hossain, M. A., Reza, M. I., Rahman, S., & Kayes, I. (2011). Climate Change and its Impacts on the Livelihoods of the Vulnerable People in the Southwestern Coastal Zone in Bangladesh. In Climate change management (pp. 237–259). https://doi.org/10.1007/978-3-642-22266-5_15
Islam, S. D., Bhuiyan, M. A., & Ramanathan, A. (2015). Climate change impacts and vulnerability assessment in coastal region of Bangladesh: A case study on Shyamnagar Upazila of Satkhira District. Journal of Climate Change, 1(1,2), 37–45. https://doi.org/10.3233/jcc-150003
Jahan, I. (2024). “Climate Change is draining my body”: Narratives of Dalit women’s health experiences in the southwestern region of Bangladesh. In Handbook on Sex, Gender and Health (pp. 1–23). https://doi.org/10.1007/978-981-19-9265-0_60-1

